Slider

ভাওয়াল রাজবাড়ী, গাজীপুর

ভাওয়াল রাজবাড়ীগাজীপুর জেলার জয়দেবপুর সদরের রানীবিলাসমনি স্কুলের পাশে অবস্থিত ভাওয়াল রাজার এই প্রসাদটি অবস্থিত। একটি বিরাট নাগলিঙ্গম ফুলের গাছ দরজার ঠিক পরেই। সারা বছরই ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকে গাছটা। দরজার ওপর জেলা পরিষদের সাইনবোর্ড। ১৯৭৮ সালে বাড়িটিকে জেলা পরিষদ ভবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রবেশমুখ পার হলেই প্রশস্ত একটি বারান্দা, এরপর একটি হলঘর। ওপরে ওঠার জন্য আগে শাল কাঠের প্রশস্ত সিঁড়ি ছিল। নাটমন্দির রয়েছে বাড়ির ঠিক মধ্যিখানে। এটি লম্বালম্বি একটি বড় টিনের ঘর। মঞ্চটি মাঝখানে। লক্ষ্নৌয়ের বাইজিরাও দাওয়াত পেত নাচার জন্য। রাজবাড়ির অন্যান্য অনুষ্ঠানও হতো এই ঘরে। জমিদার শিকারে গেলে যদি কাউকে মনে ধরত হাতি পাঠাতেন তাঁকে উঠিয়ে আনার জন্য। পশ্চিমের দোতলা ভবনে তাঁর জন্য ঘর বরাদ্দ করতেন। মনোরঞ্জনের জন্য রাজবিলাস নামের আরেকটি কামরা ছিল। রাজার বিশ্রামাগার হাওয়ামহলও ছিল এই ভবনের নিচতলায়। দক্ষিণ দিকের খিলানযুক্ত উন্মুক্ত কক্ষটি হচ্ছে ’পদ্মনাভি’। মাঝের বড় ঘরটির নাম ’রানিমহল’। ছোটবড় মিলিয়ে ৩৬০টি কক্ষ আছে এই ভবনে।

ইতিহাস:
ভাওয়াল এলাকার জমিদারদের পূর্বপুরুষ বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। এই গ্রামেরই লোক বলরাম রায় আঠারো শতকের চল্লিশ দশকে গাজীপুরের ভাওয়াল পরগনার জমিদার দৌলত গাজীর দেওয়ান হিসেবে কাজ করতেন। দৌলত গাজীর অনুপস্থিতিতে দীর্ঘদিন খাজনা প্রদান বাকি পড়ে যাওয়ায় ভাওয়াল জমিদারি নিলামে ওঠে। মুর্শিদকুলী খানের সঙ্গে সখ্য থাকায় বলরাম রায় কৌশলে এই জমিদারি হস্তগত করে ফেলতে সক্ষম হন। রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে মুর্শিদকুলী খান (শাসন: ১৭৪০-৫৬) মুসলমান জমিদারদের স্থলে পূর্ববঙ্গে হিন্দু জমিদারদের নিযুক্ত করতেন। বলরাম রায়ের মৃত্যুর (১৭৪৩) পর তার সুযোগ্য পুত্র কৃষ্ণরায় জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পান। তিনি ভাওয়াল জমিদারিকে স্থায়ীরূপ দেন। কৃষ্ণ রায়ের মৃত্যুর (১৭৫০) পর তার পুত্র জয়দেব রায় ভাওয়াল জমিদারির উত্তরাধিকার নির্বাচিত হন এবং দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন। এ সময় তার নামানুসারে ভাওয়াল এলাকার নামকরণ হয় জয়দেবপুর।

জয়দেব রায়ের মৃত্যুর (১৭৫৬) পর ভাওয়াল জমিদারি এস্টেট পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেন তার ছেলে ইন্দ্রনারায়ণ রায় । ইন্দ্রনারায়ণ রায়ের মৃত্যুর পর ধারাবাহিকভাবে তাদের উত্তরাধিকারীরা ভাওয়াল জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে যান। ১৮৫৬ সালে উত্তরাধিকারদেও একজন গোলক নারায়ণের মৃত্যুর পর তার পুত্র কালী নারায়ণ রায় জমিদারি পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। বস্তুত তার সময়ই ভাওয়াল জমিদারির ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। জমিদার নিজেই জমিদারি পরিচালনা করতেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে কাচারিতে বসতেন। কৃতিত্বের সঙ্গে জমিদারি পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ সরকার কালী নারায়ণ রায়কে বংশানুক্রমে ব্যবহারের জন্য রায় চৌধুরী এবং রাজা উপাধি প্রদান করেন। কালী নারায়ণের সময়ই ভাওয়াল রাজবাড়ী এবং ভাওয়াল শ্মশান মঠ নির্মিত হয়।

এরপরের ইতিহাস রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী, তার স্ত্রী রানী বিলাস মনি, রাজস্ব কর্মচারী ছিলেন স্বভাবকবি গোবিন্দ দাস, রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর তিন ছেলে রণেন্দ্র নারায়ণ, রমেন্দ্র নারায়ণ এবং রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী, রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর স্ত্রী বিভাবতী দেবী, তাদেও পারিবারিক চিকিৎসক আশুতোষ ডাক্তারের সাথে বিভাবতী দেবীর প্রেম, কূট কৌশল, গোপন ষড়যন্ত্র আর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা ভাওয়াল সন্নাসীর মামলা’র ইতিহাস। সে আরেক বিশাল অধ্যায়।

১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা বাতিল হয়ে গেলে যবনিকা ঘটে ভাওয়াল জমিদারদের আড়াই শ’ বছরের শাসনের ইতিহাস। কিন্তু ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা নিয়ে গল্প-উপন্যাস, যাত্রা-সিনেমা নির্মাণ চলে বহু বছর। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা আজও এদেশের প্রবীণ ব্যক্তিদের আলোড়িত করে। উনিশ শতকের শেষের দিকে নির্মিত এই মঠগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে। সবচেয়ে বড় মঠটি নির্মিত হয়েছে ভাওয়াল জমিদারির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণ নারায়ণ রায়ের উদ্দেশে। বাকিগুলো নির্মিত হয়েছে অন্য জমিদারদের স্মৃতির উদ্দেশে। রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর দুই ছেলে যথাক্রমে রণেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এবং রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর স্মৃতির উদ্দেশে মঠ নির্মিত হলেও অপর ছেলে জমিদার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর (ভাওয়াল সন্ন্যাসী) কোন স্মৃতিমঠ এই শ্মশান ভূমিতে নেই।

ভাওয়ালের এই রাজকীয় মঠের যে দিকটি যে কাউকে মুগ্ধ করে তা হলো এর নির্মাণশৈলী। গৌড়ীয় স্থাপত্য রীতি অনুসরণে নির্মিত এই মঠগুলোর প্রতিটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই মঠগুলোর অলঙ্করণও মনোমুগ্ধকর। বাংলার বিস্মৃতপ্রায় মন্দির শিল্পের এক অনন্য উদাহরণ এই মঠগুলো। একদিন সময় করে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন, মন্দ লাগবে না।

বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান ঢাকা বিভাগ: নরসিংদী, গাজীপুর, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর চট্টগ্রাম বিভাগ: কুমিল্লা, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাঙ্গামাটি, নোয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান রাজশাহী বিভাগ: সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ খুলনা বিভাগ: যশোর, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ সিলেট বিভাগ: সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ রংপুর বিভাগ: পঞ্চগড়, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, কুড়িগ্রাম ময়মনসিংহ বিভাগ: শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোণা বরিশাল বিভাগ: ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা

error: Content is protected !!